পার্বত্য জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরে ভূমি বিচ্ছিন্নকরণের প্রভাব আলোচনা কর।

পার্বত্য জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরে ভূমি বিচ্ছিন্নকরণের প্রভাব আলোচনা

ভূমিকা: উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সরকার কর্তৃক ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। তখন স্থানীয় জনগোষ্ঠী ভূমি বিচ্ছিন্নকরণের মধ্যে পড়ে। ফলে ব্যাপক জনগোষ্ঠী হঠাৎ সারিদ্র্যে পতিত হয়। আবার শরণার্থী সংকট তৈরি হয়। এছাড়াও স্থানীয় বাস্তুসংস্থান বিনষ্ট হয়।

পার্বত্য জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরে ভূমি বিচ্ছিন্নকরণের প্রভাব আলোচনা কর।


পার্বত্য জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরে ভূমি বিচ্ছিন্নকরণের প্রভাব:

১. DIDR বা উন্নয়ন বিতাড়ন:

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৬৫ সালে সর্ববৃহৎ পার্বত্য ভূমি বিচ্ছিন্নকরণ ঘটনা ঘটে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে রাঙামাটিতে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করা হয়। এসময় বাঁধের জন্য কৃত্রিম বন্যা তৈরি করা হয়। ফলে তখন ৪০,০০০ পার্বত্য পরিবার গৃহহীন হয়। এছাড়াও লাখেরও বেশি পার্বত্য জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ক্ষতির সামান্য পুনর্বাসন হলেও আর পূরণ করা আজও সম্ভব হয়নি।

২. অবকাঠামোগত উন্নয়নে তুমি বিচ্ছিন্নকরণ:

পার্বত্য এলাকার সড়ক নির্মাণ, সড়ক প্রসারণ, সরকারি ও দাপ্তরিক কাজে বাসস্থান নির্মাণ প্রভৃতি কাজের জন্য পার্বত্য ভূমি পাকিস্তান আমলে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ সময় পার্বত্য বহু জনগোষ্ঠী জোরপূর্বক ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিচ্ছিন্ন হয়।

৩. দমন সংস্থার ব্যবহার:

পার্বত্য ভূমি বিচ্ছিন্নকরণের জন্য সরকার সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বাহিনী ব্যবহার করে থাকে। ফলে পার্বত্য জনগোষ্ঠী ও সমতলে দাঙ্গা সৃষ্টি হয়। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তির মাধ্যমে এ দাঙ্গার কিছুটা সমাধান করা হয়।

৪. আন্তর্জাতিক প্রকল্পে ভূমি বিচ্ছিন্নকরণ:

সরকারি প্রণোদনায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রকল্পে দেশি ভূমি ব্যবহারের নিমিত্তে খুব সীমিত পর্যায়ে ভূমি বিচ্ছিন্নকরণ হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বহুফসলি জুমচাষ রদ করে একফসলি রাবার চাষের পরীক্ষামূলক আন্তর্জাতিক প্রকল্প এ সময় শুরু হয়। ফলে ভূমি বিচ্ছিন্নকরণ না হলেও জুমনির্ভর পার্বত্য জনগণ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৫. আইনি কাঠামোর নেতিবাচক প্রভাব:

পার্বত্য জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরে ভূমি বিচ্ছিন্নকরণ প্রক্রিয়ায় আইনগত কাঠামো তাদের প্রতিকূলে কাজ করে থাকে। এখানে সাংবিধান কাঠামো খুব পরিষ্কার নয়। আইনগত তথ্য পার্বত্য গোষ্ঠীর মধ্যে তেমন একটা থাকে না। সচেতনতার অভাবে ও অশিক্ষার সুযোগে পার্বত্য ভূমি বিচ্ছিন্নকরণ অনেক সহজ।

৬ সামাজিক বনায়ন এবং ECO পার্ক প্রকল্প:

সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যাপক ভূমিতে সমন্বিত বনায়ন কর্মসূচির আওতায় বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূমি বিচ্ছিন্নকরণ করা হয়।

৭. অবকাশ কেন্দ্র স্থাপন:

পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে (বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি) দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক অনেক স্থান রয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক সেখানে ভ্রমণ করতে যায়। সরকারি অথবা বেসরকারি উদ্যোগে নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে পর্যটক কেন্দ্র স্থাপন করতে গিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি বিচ্ছিন্নকরণ করা হয়। এতে পার্বত্য জনগোষ্ঠী স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়।

৮. EPZ অঞ্চল তৈরি:

চট্টগ্রামে EPZ. অঞ্চল বা রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল তৈরিতে বহু ভূমি বিচ্ছিন্নকরণ করা হয়েছিল। উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে যদি পার্বত্যাঞ্চালে একটি EPZ করা হয় তবে পার্বত্য বহু জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে স্থান ত্যাগ করবে এবং নিচ্ছিন্ন হবে।

৯. পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্প:

সরকারি বিভিন্ন পরিবেশ সংরক্ষন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ কথা হয়। এতে নীতি নির্ধারণে অস্বচ্ছতা থাকে। পার্বত্যাঞ্চলে এ রকম প্রকল্পে পার্বত্য গোষ্ঠীর ভূমি বিচ্ছিন্নকরণ ঘাট থাকে। পরিবেশ। সংরক্ষণ প্রকল্পে এসব মানুষকে অপ্যরজেয় দেখিয়ে খুব সহজে তাদের আবাস উচ্ছেদ করে ফেলা হয়।

১০. ভূমিসংক্রান্ত আইনের অস্বচ্ছতা:

পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিসংক্রান্ত আইনের ব্যাপক অস্বচ্ছতা রয়েছে। বাংলাদেশের আইনে ভূমি প্রত্যার্পণ, ভূমি বিচ্ছিন্নকরণ এবং ভূমি হতে বিতাড়ন ইত্যাদি প্রক্রিয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি নির্দেশনা নেই। তাই পার্বত্য জনগোষ্ঠী ভূমি হস্তক্ষেপে রাখা হয়ে ভূমি বিচ্ছিন্নতার স্বীকার হয়।

১১. তথ্যের অভাব:

ভূমি রেকর্ড, মালিকানা, সরকারি হিসাব এবং তৎসম্পর্কিত সঠিক তথ্য পার্বত্য গোষ্ঠীর নিকট তেমন একটা পৌঁছায় না। তাই তারা ভূমি স্থানান্তরেয় স্বীকার হয়। তারা তখন বিচ্ছিন্নকরণ প্রক্রিয়ার কবলে পড়ে যায়। ভূমি আইনের দীর্ঘসূত্রিতা পার্বত্যাঞ্চালে সবচেয়ে বেশি। তাই নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনে।

১২. সংখ্যালঘু প্রক্রিয়া:

মূলধারার জনগোষ্ঠীরা পার্বত্য গোষ্ঠীদের সবসময় সংখ্যালঘু মানসিকতা দিয়ে থাকে। তারা পার্বতা গোষ্ঠীদের অন্যান্য সবকিছুর মতো ভূমি সুবিধা যখন তখন কেড়ে নিতে সমর্থ হয়। তাই পার্বত্য গোষ্ঠী ভূমি বিচ্ছিন্নকরণের ভয়ে থাকে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, পার্বত্য জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরে ভূমি বিচ্ছিন্নকরণের প্রভাব নিঃসন্দেহে তাদের জন্য নেতিবাচক। তুমি বিচ্ছিন্নকরণ পার্বত্য গোষ্ঠীর স্থানান্তর বৃদ্ধি করে থাকে। তাই এ বিষয় সমাধানে অতিসত্বর সরকারের আশু দৃষ্টি কামনা করছি।

No comments:

Post a Comment